জনপ্রিয় কোমল পানীয় সেভেন-আপের ‘ন্যাচারাল লেমন ফ্লেভার এক্সট্রা ফিজ’ পণ্যে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি রাসায়নিক মিষ্টিকারক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে পণ্যটিকে মানসম্মত নয় ও অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি করেছে মামলার বাদীপক্ষ। এ ঘটনায় উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আগামী ১৬ নভেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ঢাকার বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলাটি করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। বিষয়টি নিয়ে ১৪ ও ১৫ অক্টোবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে?
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ব্রাদার্স কম্পিউটার্স অ্যান্ড কনফেকশনারি থেকে ২০০ মিলিলিটারের তিনটি সেভেন-আপ এক্সট্রা ফিজের বোতল নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নির্ধারিত BDS 1123:2022 মানদণ্ডের ছয়টি প্যারামিটারের মধ্যে তিনটিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি পানীয়টি। নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কৃত্রিম রাসায়নিক ও মিষ্টিকারক ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে।
মামলার আবেদনে আরও বলা হয়েছে, পণ্যটির মোড়কে ‘চিনি নেই, তবে নন-নিউট্রিটিভ সুইটনার রয়েছে’ এমন তথ্য উল্লেখ করা হলেও লেখার আকার এত ছোট যে তা সহজে দেখা বা পড়া যায় না। বাদীপক্ষের অভিযোগ, এতে মোড়কবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০১৭ এবং পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা, ২০২১ লঙ্ঘিত হয়েছে।
অ্যাসপারটেম নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন
অ্যাসপারটেম একটি কৃত্রিম মিষ্টিকারক, যা চিনি ছাড়াই খাবার ও পানীয়কে মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হয়। ২০২৩ সালের ১৪ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) অ্যাসপারটেমকে ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে গ্রুপ ২বি-তে শ্রেণিবদ্ধ করে।
আইএআরসি মানুষের শরীরে ক্যানসার সৃষ্টির বিষয়ে সীমিত প্রমাণ পাওয়ার ভিত্তিতে এই শ্রেণিবিন্যাস করে। তবে একই সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি (জেইসিএফএ) অ্যাসপারটেমের গ্রহণযোগ্য দৈনিক মাত্রা প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ৪০ মিলিগ্রাম বহাল রাখে।
অর্থাৎ, অ্যাসপারটেমকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হলেও নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্রহণের ঝুঁকি মূল্যায়ন আলাদা বিষয়। সেভেন-আপের আলোচিত নমুনায় অভিযোগ অনুযায়ী অতিরিক্ত রাসায়নিক পাওয়া যাওয়ার বিষয়টিও পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কী বলছে মামলার নথি?
মামলাটি করেছেন ডিএসসিসির নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক ও প্রসিকিউটিং অফিসার মো. কামরুল হাসান। মামলার অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর কয়েকটি ধারা লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সেভেন-আপ ন্যাচারাল লেমন ফ্লেভার এক্সট্রা ফিজের সংশ্লিষ্ট ৮৭৪ নম্বর ব্যাচসহ অভিযোগে উল্লেখ করা পণ্য বাজার থেকে জব্দ ও প্রত্যাহারের নির্দেশনা চেয়েছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে আদালতে মামলা হওয়া বা সমন জারি হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। বিষয়টি বিচারাধীন এবং অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুব কবীর মিলন বলেন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পণ্যের মান বজায় না রাখলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পণ্য নির্ধারিত মান পূরণ করলেও লেবেলিংয়ের বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মামলার শুনানিতে বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকার জনসংখ্যার তুলনায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের সংখ্যা সীমিত এবং এসব আদালতে আরও অনেক মামলা বিচারাধীন থাকায় শুনানির তারিখ পেতে সময় লাগতে পারে।
কোম্পানির বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ট্রান্সকম বেভারেজেস লিমিটেডের হেড অব ব্র্যান্ড শরিফুদ্দিন শ্যামলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে অভিযোগকারী পক্ষের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপেও প্রশ্ন পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হয়েছিল, তবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, সেভেন-আপের নির্দিষ্ট একটি পণ্যের মান, রাসায়নিকের মাত্রা ও লেবেলিং নিয়ে ওঠা অভিযোগ এখন আদালতের বিবেচনাধীন। ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরীক্ষার ফলাফল, প্রযোজ্য মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টির স্বচ্ছ নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ।
আরু|



