back to top

বুধবার, ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনা আমলে মানবাধিকার নিয়ে সরব ছিলেন নাভি পিল্লাই

নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ অক্টোবর ২০২৬ ১:৫৯ অপরাহ্ণ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারপ্রধান।

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। বিশেষ করে, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গণবিচার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং বিপুলসংখ্যক আসামির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান আইনজ্ঞ।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নাভি পিল্লাইকে দেওয়ার ঘোষণা আসে। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। নোবেল কমিটির এ ঘোষণার পর বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের আমলে মানবাধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে কঠোর অবস্থান

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দপ্তরে বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে ৭৪ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এনেছিলেন নাভি পিল্লাই।

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ আদালত পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরদিন ৬ নভেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে পিল্লাই এই রায় ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, শত শত আসামিকে একসঙ্গে বিচারের মুখোমুখি করা, পর্যাপ্ত ও সময়মতো আইনজীবীর সহায়তা না পাওয়া এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিদ্রোহের ঘটনায় আটক কয়েকজনের হেফাজতে মৃত্যুর খবর এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা প্রমাণ আদালতে ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।

পিল্লাইয়ের বক্তব্য ছিল, পিলখানার হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি তাঁর সমবেদনা রয়েছে। তবে অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নামে গণবিচার, নির্যাতন কিংবা যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের সাজা ব্যক্তিভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া প্রমাণ আদালতে ব্যবহার না করার ওপর গুরুত্ব দেন।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও উদ্বেগ

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়া এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

তবে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ছিল। নাভি পিল্লাইও এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।

২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত জাতিসংঘের বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিচারপ্রক্রিয়া অবশ্যই উচ্চমানের ন্যায্যতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হতে হবে।

তৎকালীন মানবাধিকারপ্রধান হিসেবে তিনি ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বিচারগুলোর ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানান। জাতিসংঘের অবস্থান ছিল, গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারেও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা ও অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতাই ছিল মূল প্রশ্ন

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ছিল দুটি পৃথক ঘটনা। তবে উভয় ক্ষেত্রেই নাভি পিল্লাইয়ের বক্তব্যে একটি অভিন্ন বিষয় উঠে আসে গুরুতর অপরাধের বিচার করার পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।

তাঁর অবস্থানকে বাংলাদেশের পুরো শাসনামল সম্পর্কে একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখার চেয়ে নির্দিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর প্রকাশিত উদ্বেগ হিসেবে উপস্থাপন করাই যথাযথ। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনেই।

মানবাধিকার রক্ষায় দীর্ঘ কর্মজীবন

দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ১৯৪১ সালে জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লাই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হন। পরে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রেসিডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন তিনি। কর্মজীবনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্যাতন প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সুরক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান আবারও সামনে এসেছে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন জোরদারে অবদানের জন্য তাঁকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আরু|

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল খবরবাংলা২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন info@khaborbangla24.com ঠিকানায়।

চন্দনাইশে সৌদিয়ার বাস উল্টে আহত ২০

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌদিয়া পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী...

চট্টগ্রাম-সালালাহ রুটে সরাসরি উড়বে সালাম এয়ার

চট্টগ্রাম থেকে ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সালালাহতে সরাসরি ফ্লাইট চালু...

দেশের ৮ বিভাগের ৮ গ্রাম পুলিশ পাচ্ছেন সরকারি সম্মাননা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেশের আট বিভাগের...

হাসপাতালে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটুনি, ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা...

৭১ ও ২৪-এর পরাজিত শক্তি এক হয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: মীর হেলাল

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরাজিত...

চন্দনাইশে সৌদিয়ার বাস উল্টে আহত ২০

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌদিয়া পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী...

চট্টগ্রাম-সালালাহ রুটে সরাসরি উড়বে সালাম এয়ার

চট্টগ্রাম থেকে ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সালালাহতে সরাসরি ফ্লাইট চালু...

দেশের ৮ বিভাগের ৮ গ্রাম পুলিশ পাচ্ছেন সরকারি সম্মাননা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেশের আট বিভাগের...

হাসপাতালে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটুনি, ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা...

৭১ ও ২৪-এর পরাজিত শক্তি এক হয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: মীর হেলাল

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরাজিত...

সর্বশেষ

চন্দনাইশে সৌদিয়ার বাস উল্টে আহত ২০

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌদিয়া পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী...

চট্টগ্রাম-সালালাহ রুটে সরাসরি উড়বে সালাম এয়ার

চট্টগ্রাম থেকে ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সালালাহতে সরাসরি ফ্লাইট চালু...

দেশের ৮ বিভাগের ৮ গ্রাম পুলিশ পাচ্ছেন সরকারি সম্মাননা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেশের আট বিভাগের...

হাসপাতালে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটুনি, ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা...