আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ব্যক্তিজীবনের একটি অপ্রকাশিত অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাপানি সরকারি নথি, ব্যাংকিং কাগজপত্র, আলোকচিত্র ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ১৯৯২ সালে যুক্তরাজ্যে জাপানি নাগরিক মিনাকো কাওয়ারাজাকিকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। তাদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট যুক্তরাজ্যে মিনাকো কাওয়ারাজাকির সঙ্গে বিয়ে হয় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর। এ বিয়ের একটি সনদ ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় জাপান দূতাবাস থেকে ইস্যু করা হয়। সেখানে স্বামী হিসেবে ‘চৌধুরী আখতারুজ্জামান’ এবং স্ত্রী হিসেবে ‘মিনাকো কাওয়ারাজাকি’র নাম রয়েছে।
এই দম্পতির জ্যেষ্ঠ কন্যা নীনা কাওয়ারাজাকি ১৯৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল হংকংয়ে জাপানের কনস্যুলেট-জেনারেল থেকে ইস্যু করা জন্মসনদে নীনার বাবা হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী এবং মা হিসেবে মিনাকো কাওয়ারাজাকির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সম্পর্কের ঘরে তাকে প্রথম কন্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মিনাকো দুই কন্যাসন্তান থাকার কথা জানিয়েছেন; তবে প্রকাশিত নথিতে ছোট মেয়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ব্যাংকের এফডিআর ঘিরে সামনে আসে বিষয়টি
প্রায় ১৪ বছর আগে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুর পরও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখায় নীনা কাওয়ারাজাকি (জামান চৌধুরী) নামে দেওয়া একটি চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠিতে নীনা জানান, ২০১২ সাল থেকে তার প্রয়াত বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে তার নামে একটি স্থায়ী আমানত রয়েছে। তিনি ওই এফডিআর ভাঙিয়ে অর্থ পরিশোধের অনুরোধ করেন এবং বাংলাদেশে না থাকায় তার পক্ষে অর্থ গ্রহণের জন্য মা মিনাকো কাওয়ারাজাকিকে অনুমতি দেন।
এ ছাড়া ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির একটি ইউসিবি এফডিআর রসিদেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী ও নীনা কাওয়ারাজাকির নাম রয়েছে। রসিদ অনুযায়ী, আমানতের পরিমাণ ছিল এক কোটি টাকা এবং তিন মাস মেয়াদি ওই আমানতে বার্ষিক সুদের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বর্তমানে ওই আমানতের স্থিতি কত, নিয়মিত নবায়ন করা হয়েছিল কি না কিংবা নীনার আবেদনের পর ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
সম্পত্তি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জাপানি স্ত্রী ও সন্তানদের বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। তার নির্বাচনী এলাকার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করেছেন, বাবু জীবিত থাকতেই দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পত্তির বিষয়টি পারিবারিকভাবে মীমাংসা করা হয়েছিল এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের তথ্য কেন উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেছেন, কেন ওই তথ্য হলফনামায় ছিল না, তা তাদের জানা নেই এবং বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক।
এ কারণে সম্পত্তির অধিকার বা হলফনামায় তথ্য না থাকার বিষয়টি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও আইনগত অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথম সংসার ও রাজনৈতিক পরিচয়
প্রকাশ্য জীবনী অনুযায়ী, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মেয়ে নূর নাহার জামানকে বিয়ে করেছিলেন। এই সংসারে তাদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে ছিল। ২০১২ সালে তার মৃত্যুর সময়ও প্রকাশ্য সংবাদ প্রতিবেদনে স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তাদের বড় ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী পরবর্তীতে ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং পরে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন; তিনি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম চেম্বার ও এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে ছিলেন।
তিনি ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকার আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
সব মিলিয়ে, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জাপানি স্ত্রী ও দুই কন্যার বিষয়টি দীর্ঘদিন পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে মূলত সরকারি নথি ও একটি ব্যাংকিং লেনদেনের সূত্র ধরে। বিয়ের নথি ও জ্যেষ্ঠ কন্যার জন্মসনদসহ কিছু নথির তথ্য প্রকাশ্যে এলেও সম্পত্তির চূড়ান্ত বণ্টন, এফডিআরের বর্তমান অবস্থা এবং পারিবারিকভাবে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল এসব বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
আরু|



