বক্স অফিসে বড় সাফল্য পাওয়া তারকাবহুল সিনেমা নয়, বরং তুলনামূলক ছোট বাজেটের একটি মারাঠি সিনেমাকেই অস্কারের মঞ্চে পাঠাচ্ছে ভারত। রানবীর সিং অভিনীত ‘ধুরন্ধর’সহ ৩৩টি সিনেমাকে পেছনে ফেলে ৯৯তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে ভারতের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পেয়েছে সন্তোষ দাভাখারের ‘গোনধল’।
ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া এফএফআই ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সিনেমাটিকে ভারতের অস্কার এন্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করে। ৩৩টি সিনেমার মধ্যে ১৪টি ছিল হিন্দি ভাষার; মারাঠি, তেলুগু ও গুজরাটি ভাষার চারটি করে সিনেমাও প্রতিযোগিতায় ছিল।
অস্কারে যাওয়ার খবরটি সামনে আসার পরই সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয় সিনেমাটির বক্স অফিস পারফরম্যান্স নিয়ে। কারণ, ‘গোনধল’-এর আগের বাণিজ্যিক যাত্রা ছিল বেশ সীমিত।
ট্রেড ট্র্যাকার Sacnilk-এর হিসাব অনুযায়ী, ভারতে সিনেমাটির মোট আয় ছিল প্রায় ৯০ লাখ রুপি, যেখানে নেট আয় প্রায় ৮৪ লাখ রুপি। অর্থাৎ, বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমার তুলনায় এর ব্যবসা ছিল অনেক কম।
তাহলে কেন এমন একটি সিনেমাকে অস্কারের জন্য বেছে নিল ভারত?
এর উত্তর মিলছে এফএফআইয়ের জুরি সদস্য বিবেক ভাসওয়ানির বক্তব্যে। ‘ধুরন্ধর’ কেন নির্বাচিত হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, জুরির কিছু সদস্য সিনেমাটি পছন্দ করলেও সেটিকে অস্কারের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেননি। ১৪ সদস্যের জুরিতে ‘ধুরন্ধর’-এর পক্ষে ভোট পড়েছিল চারটি।
ভাসওয়ানির বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় সংস্কৃতিকে যে ধরনের স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করার বিষয়টি জুরি খুঁজছিল, সিনেমাটি সেই মানদণ্ডে যথেষ্ট এগোতে পারেনি।
অন্যদিকে ‘গোনধল’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর সাংস্কৃতিক শিকড়। গ্রামীণ মহারাষ্ট্রের বহু পুরোনো লোকজ আচার ‘গোনধল’-কে সিনেমাটির কেন্দ্রীয় আবহ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাতভর চলা এই ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনায় থাকে দেবতার বন্দনা, গান, সংগীত, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য। সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই সিনেমার গল্প এগিয়েছে।
সিনেমার গল্পে রয়েছে সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, প্রতারণা, ক্ষমতা ও বেঁচে থাকার লড়াই। গ্রামীণ মহারাষ্ট্রের এক রাতের গোনধল অনুষ্ঠানের পটভূমিতে সুমন নামের এক নারীর জীবন ও তার জটিল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার।
অস্কারে মনোনয়ন পাওয়ার আগেই অবশ্য চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে স্বীকৃতি পেয়েছিল ‘গোনধল’। ২০২৫ সালের ৫৬তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ায় সিনেমাটির পরিচালক সন্তোষ দাভাখার ‘সেরা পরিচালক’ হিসেবে সিলভার পিকক পুরস্কার পান। উৎসবের জুরি সিনেমাটির ঐতিহ্য, নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার ধরনকে বিশেষভাবে প্রশংসা করে।
এরপর ২০২৬ সালের ১৭তম বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোনধল’ ফিপ্রেসকি পুরস্কারও অর্জন করে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন FIPRESC I সিনেমাটির গল্প, আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ফর্মের সমন্বয় এবং গ্রামীণ মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক আবহকে গুরুত্ব দিয়েছে।
অর্থাৎ, ‘গোনধল’-এর অস্কারযাত্রার পেছনে বক্স অফিসের হিসাব নয়, বরং জুরি বিবেচনায় এসেছে সিনেমার গল্প, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, নির্মাণশৈলী ও উৎসবভিত্তিক স্বীকৃতি। বাণিজ্যিক সাফল্য আর অস্কারের জন্য ভারতের আনুষ্ঠানিক নির্বাচন দুটি যে একই মানদণ্ডে নির্ধারিত হয় না, ‘গোনধল’-এর নির্বাচন তারই একটি উদাহরণ।
অস্কারযাত্রাকে সামনে রেখে সিনেমাটির বিশেষ প্রদর্শনও শুরু হচ্ছে। ৯ অক্টোবর থেকে মুম্বাই, পুনে, দিল্লি, চেন্নাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুতে বিশেষ পেইড প্রিভিউ হবে। এরপর সিনেমাটি ছয়টি ভাষায় মারাঠি, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড় বিস্তৃতভাবে মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
‘গোনধল’ ভারতের অস্কার ইতিহাসে চতুর্থ মারাঠি সিনেমা হিসেবে এই প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেল। এর আগে ‘শ্বাস’, ‘হারিশচন্দ্রাচি ফ্যাক্টরি’ ও ‘কোর্ট’ ভারতীয় অস্কার এন্ট্রি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।
৯৯তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ১৪ মার্চ। তবে ভারতের এই সিনেমা চূড়ান্ত মনোনয়নের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে কি না, সেটিই এখন অস্কারযাত্রার পরবর্তী ধাপ।
আরু|



