বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং দেশের অর্থনীতিতে গতি আনতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে মাত্র তিন জেলা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে মোট ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এই তিন জেলায় এসেছে ১ হাজার ৮৮২ কোটি ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৫২ দশমিক ৯২ শতাংশ।
প্রবাসী আয় আহরণে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা জেলা। এ জেলায় এসেছে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রামে এসেছে ৩২৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলার এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা কুমিল্লায় এসেছে ২০৮ কোটি ডলার। এছাড়া সিলেটে ১৫৮ কোটি, নোয়াখালীতে ১০৭ কোটি ৫৫ লাখ, ফেনীতে ৯৯ কোটি ৫৪ লাখ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৯১ কোটি ৫৫ লাখ, চাঁদপুরে ৭৯ কোটি, টাঙ্গাইলে ৬৪ কোটি ১৮ লাখ এবং মুন্সিগঞ্জে ৬০ কোটি ৬৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
সব মিলিয়ে শীর্ষ ১০ জেলায় এসেছে ২ হাজার ৫৪২ কোটি ডলার, যা দেশের মোট রেমিট্যান্সের ৭১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে লালমনিরহাট জেলায়, যেখানে এসেছে মাত্র ১ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। এছাড়া পঞ্চগড়ে ২ কোটি, রাঙামাটিতে ২ কোটি ১০ লাখ, বান্দরবানে ২ কোটি ২৭ লাখ, খাগড়াছড়িতে ৩ কোটি ২৬ লাখ, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ কোটি ৩০ লাখ, শেরপুরে ৪ কোটি, জয়পুরহাটে ৪ কোটি ৫৭ লাখ, কুড়িগ্রামে ৪ কোটি ৯০ লাখ এবং নীলফামারীতে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সর্বনিম্ন এই ১০ জেলা মিলিয়ে এসেছে মাত্র ৩৩ কোটি ২২ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা থেকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া ও উত্তর আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের প্রবণতা বেশি। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক নেটওয়ার্কের কারণে এসব এলাকা থেকেই নতুন কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বাড়ছে এবং রেমিট্যান্সও বেশি আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, কোনো এলাকায় একবার অভিবাসনের ধারা তৈরি হলে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মাধ্যমে সেই ধারা আরও বিস্তৃত হয়। ফলে ওই অঞ্চল থেকেই বেশি রেমিট্যান্স আসে। তবে এতে একদিকে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও অন্যদিকে কম রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত জেলাগুলোর সঙ্গে বৈষম্যও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো এলাকার মানুষ একবার যে দেশে যেতে শুরু করে, পরবর্তীতে একই এলাকার অন্যরাও সেখানে যেতে আগ্রহী হয়। আবার কিছু অঞ্চলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম। এ কারণেই জেলাভিত্তিক রেমিট্যান্সে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এই বৈষম্য কমাতে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত জেলাগুলোতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়কে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা গেলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আঞ্চলিক বৈষম্যও কমবে।
আরু/



