আজ (৩০ জুলাই) বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। দিবসটি ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই এখন সবচেয়ে বেশি। শুধু ইতালিই নয়, ২০২৬ সালে গ্রীসে সাগরপথে প্রবেশকারীদের তালিকাতেও শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত লিবিয়া হয়ে সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এই বিপজ্জনক যাত্রাপথে প্রতিবছর শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। অনেকেই নির্যাতন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সহায়তায় গত ১৫ বছরে ইউরোপগামী পথে আটক বা উদ্ধার হওয়া ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে, গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কত মানুষ মানব পাচারের শিকার হন, তার নির্ভুল পরিসংখ্যান না থাকলেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৯০ হাজার ডিপোর্টি দেশে ফেরেন। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এভাবে দেশে ফিরেছেন সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি। এছাড়া সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বছরে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির গবেষণায় দেখা গেছে, মানব পাচারকারীরা ৩টি বড় ও ১৮টি ছোট রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশিদের ইউরোপে পাচার করে। সম্প্রতি নতুন রুট হিসেবে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও মালয়েশিয়া)।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা নেওয়ার পর নিরাপত্তারক্ষী বা নির্মাণশ্রমিকের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশির মৃত্যুর কথাও উঠে এসেছে।
মানব পাচার রোধে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানব পাচারসংক্রান্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নতুন ৫০০টির বেশি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। অধিকাংশ মামলায় এখনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর আইন করলেই মানব পাচার বন্ধ হবে না। দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পাচারকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া মানব পাচারের মতো সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরু/


