চুল ও গোঁফ কেটে চেহারায় আনা হয়েছিল আমূল পরিবর্তন। উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পার হওয়া। ডিবির তল্লাশিচৌকিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে দাবি করছিলেন পুরান ঢাকার ‘শ্রমিক’, তার নাম বলেছিলেন ‘মিরাজ’। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। চাতুরতা আর ছদ্মবেশের আড়ালে থাকা চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরও তিনজনকেও আটক করা হয়।
বুধবার ভোর পৌনে ৪টার দিকে যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যশোর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সকাল ১০টার দিকে তাদের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলাম।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম পুলিশের রিকুইজিশনের ভিত্তিতে যশোর ডিবি ও কোতোয়ালি থানার মোট নয়টি দল অভিযান পরিচালনা করে। যশোর-ঢাকা মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে আটক করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই যশোরে এসেছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। একসময় সাধারণ জীবনযাপন করলেও পরে তিনি চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেন। পরবর্তীতে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে তিনি সাজ্জাদ গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিতি পান। পরে দুবাইয়ে অবস্থান করেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে ফোনে চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা এবং গুলিবর্ষণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় ডিডিএন নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায়ও ডেভিড ইমনের নাম সামনে আসে। গত ১৩ জুলাই ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, হামলার দুই দিন আগে, ১১ জুলাই, হোয়াটসঅ্যাপে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর হামলার সময় প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাবপত্র ও কাচের দরজাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অফিসের ড্রয়ারে থাকা ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, একটি ক্যানন প্রিন্টার এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের কাঁধের ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ওই ব্যাগে কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার পর র্যাব ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। হামলার সিসিটিভি ফুটেজেও অস্ত্রধারী একটি দলকে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালাতে দেখা গেছে।
এর আগে গত সপ্তাহে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সল আহম্মেদ জানিয়েছিলেন, ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত টিম কাজ করছে এবং তাকে ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চলছিল। সেই অভিযানের ধারাবাহিকতায় অবশেষে যশোর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো।
আরু/


