প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায় বা সামান্য কাজেই অবসাদ অনুভূত হয়, তবে সেটিকে শুধু মানসিক চাপ বা বয়সের প্রভাব ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কোষীয় শক্তি উৎপাদনে সমস্যা বা সেলুলার ফ্যাটিগ (Cellular Fatigue)-এর মতো কারণও থাকতে পারে।
মানবদেহের প্রতিটি কোষে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়া খাদ্য থেকে শক্তি (এটিপি) উৎপাদন করে। একে শরীরের ‘পাওয়ারহাউস’ বলা হয়। যখন মাইটোকন্ড্রিয়া স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন কোষ পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও শরীরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অনিদ্রা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং বার্ধক্যের মতো কারণ মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে দৈনন্দিন কাজ, যেমন সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, অফিসের কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কিংবা সাধারণ কথোপকথন চালিয়েও অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রামই দেয় না; এই সময় কোষের মেরামত, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং বিপাকক্রিয়াও স্বাভাবিক হয়। তাই দীর্ঘ সময় ঘুমালেও যদি ঘুমের মান ভালো না হয়, তবে শরীর পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হতে পারে না।
একই সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাবও ক্লান্তি বাড়াতে পারে। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা উন্নত করে এবং শরীরের শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
- পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্তি না কমা
- সারাদিন শক্তির অভাব অনুভব করা
- কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা
- সামান্য পরিশ্রমেই অবসাদ
- ব্যায়াম বা অসুস্থতার পর স্বাভাবিক হতে বেশি সময় লাগা
তবে চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্লান্তি থাকলেই যে সেলুলার ফ্যাটিগ রয়েছে, এমন নয়। রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, সংক্রমণ, ভিটামিন বি-১২ বা আয়রনের ঘাটতি, ঘুমের ব্যাধি, বিষণ্ণতা এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অকারণ ক্লান্তি, ওজন কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, জ্বর বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত।
ক্লান্তি কমাতে যা করতে পারেন
- প্রতিদিন ৭–৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা
- সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে মেডিটেশন বা রিলাক্সেশন অনুশীলন করা
- ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকা
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিকে অবহেলা না করে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঠিক রোগ নির্ণয় ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
আরু/


