স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও বা ‘রিলস’ এখন সব বয়সী মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে রিলস বা শর্ট ভিডিও দেখার অভ্যাস শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিমিত প্রযুক্তি ব্যবহার উপকারী হলেও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং অনবরত রিলস স্ক্রল করার অভ্যাস ধীরে ধীরে আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। এতে মনোযোগ কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘসময় রিলস দেখলে যেসব ক্ষতি হতে পারে
১. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়
অল্প সময়ের অসংখ্য ভিডিও একটানা দেখার ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত নতুন উদ্দীপনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা, অফিসের কাজ বা অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
২. ঘুমের সমস্যা বাড়ে
রাতে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারের ফলে স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) শরীরের মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করে। এতে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং অনিদ্রার ঝুঁকি বাড়ে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব
অতিরিক্ত রিলস দেখার ফলে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকীত্ব, খিটখিটে মেজাজ এবং বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অন্যের জীবন দেখে নিজের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও মানসিক চাপ বাড়ায়।
৪. শারীরিক সক্রিয়তা কমে যায়
দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে মোবাইল ব্যবহারের কারণে হাঁটাচলা ও ব্যায়াম কমে যায়। এতে ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা, ঘাড় ও কোমরের ব্যথা এবং জয়েন্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৫. চোখের সমস্যা
একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, চোখে জ্বালাপোড়া এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৬. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়
রিলসে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো কমে যায়। অনেকেই বন্ধু-স্বজনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বদলে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাতে শুরু করেন।
প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও রয়েছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি সবসময় ক্ষতিকর নয়। বিশেষ করে প্রবীণদের ক্ষেত্রে ভিডিও কলে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন গেম খেলা বা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে এবং একাকীত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে সবকিছুর মূল বিষয় হলো—পরিমিত ব্যবহার।
কীভাবে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করবেন?
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করা।
- ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রাখা।
- নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ও বাইরে সময় কাটানো।
- বই পড়া, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা।
- প্রয়োজন হলে মোবাইলের Screen Time বা Digital Wellbeing ফিচার ব্যবহার করে সময় সীমা নির্ধারণ করা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও সেটি যেন আসক্তিতে পরিণত না হয়। সুস্থ শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পরিমিত স্ক্রিন ব্যবহার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আরু/


