হিমালয়ের দ্রুত গলে যাওয়া হিমবাহ ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশসহ আট দেশের জন্য নতুন করে সতর্কতা জানিয়েছেন গবেষকরা। তাদের আশঙ্কা, হিমবাহ গলা, হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে।
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমার। এই বিশাল পর্বত অঞ্চলটি আফগানিস্তান থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এ অঞ্চলের নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা।
সম্প্রতি নেপাল-চীন সীমান্তে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ শিলা ও বরফধসের পর এই ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশ্ব আবহাওয়া অ্যাট্রিবিউশন এর ১৭ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই বিপর্যয়ে নেপালে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। গবেষকদের মতে, দ্রুত উষ্ণায়ন, হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়া এবং পাহাড়ের জমাট মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো পাহাড়কে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এককভাবে ওই বিপর্যয়ের কারণ নয়; বরং দীর্ঘদিনের ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতার সঙ্গে উষ্ণায়ন ও হিমবাহের পরিবর্তন মিলে ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
নজরদারিতে বড় ঘাটতি
সিস্টেমিক এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহ রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২১টি হিমবাহকে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত পরিবর্তন শনাক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভারতেই প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদকে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি হ্রদকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের জনপদে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হিমালয়ের পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ি দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই অঞ্চল থেকেই এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত।
গঙ্গা ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়েছে। আর তিব্বতে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এসে যমুনা নামে পরিচিত।
ফলে হিমালয়ের হিমবাহ, নদীর প্রবাহ এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের নদী, পানি সরবরাহ, কৃষি ও বন্যা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, একদিকে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে নদীতে পানির প্রবাহ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের পানি কমে গেলে নদীগুলোর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সিস্টেমিক এর প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতিকে ‘পিক ওয়াটার’-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটি পর্যায়, যখন হিমবাহ গলার কারণে নদীর পানিপ্রবাহ আর বাড়বে না; বরং পরে কমতে শুরু করতে পারে।
বাড়াতে হবে আগাম সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের প্রতিটি হিমবাহ বা পাহাড়ের প্রতিটি ঢালকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবে কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বাড়ানো সম্ভব।
এ জন্য স্যাটেলাইট তথ্য, রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি, পাহাড়ের নড়াচড়া শনাক্ত করার সেন্সর এবং হিমবাহ হ্রদের পানি পর্যবেক্ষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।
একই সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো দেশের সীমান্তে থেমে থাকে না। তাই হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রস্তুতি, তথ্য বিনিময় এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
কারণ হিমালয়ের পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ি এলাকার মানুষের ওপর নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পানি, কৃষি, জীবিকা ও নিরাপত্তা।
আরু|



