জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে সরকারে এলেও জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে বিএনপি ব্যর্থ হচ্ছে। তার দাবি, দেশের জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের দলীয় স্বার্থ আদায় করতেই বিএনপি সরকারে গেছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না, দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা বা নেগোসিয়েশন কেন করা যাচ্ছে না এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে। ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ কেন জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পারছে না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব পরিস্থিতি থেকেই বোঝা যায়, বিএনপি জাতীয় স্বার্থ নয়, বরং দলীয় স্বার্থ আদায়কে গুরুত্ব দিয়ে সরকারে গেছে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণ গণভোটে ভোট দিলেও সেই রায় বাস্তবায়ন হয়নি। বিচার নিশ্চিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শহীদ ওসমান হাদী হত্যার বিচার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা।
তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে একটি মামলার রায় এসেছে, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় তাদের ক্ষেত্রেই আসে যারা দেশে নেই। দেশে অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে কেন এমন রায় আসে না এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। দেশে থাকা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর দেখতে চান বলেও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম।
দেশের বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সারাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট চলছে। রংপুর অঞ্চলের বড় একটি অংশের মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা প্রয়োজনীয় সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘নজিরবিহীন দলীয়করণ’, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও এলাকায় সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। শিশু, নারীসহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারিও দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জোটের কোনো নেতাকর্মীর ওপর হামলা হলে তারা পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকবেন এবং সরকারকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।
সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি পুলিশ সংস্কার কমিশন, গুমসংক্রান্ত আইন এবং বিরোধীদল দমনে পুলিশের ব্যবহারের বিষয়েও বক্তব্য দেন।
এ ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকে স্বৈরাচার হতে দেবে না।
রংপুরবাসীর উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থীদের সংসদ নির্বাচনে জয়ী করায় তারা রংপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধী দলে ভোট দেওয়ার কারণে রংপুর উন্নয়নের বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হবে এমন কথা শোনা যাচ্ছে।
রংপুরের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের আট দফার অন্যতম দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। এটি শুধু দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে বাস্তবায়ন দেখতে চান তারা।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, আট দফা দাবি আদায়ে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। জনগণ সঙ্গে থাকলে এবং ঐক্য অটুট থাকলে দাবিগুলো আদায় করে ঘরে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
এর আগে শনিবার সকালে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত আট দফার মধ্যে রয়েছে- গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
আরু|



