আজ ১৩ জুন। রাঙামাটির ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের ৯ বছর পূর্ণ হলো। ২০১৭ সালের এই দিনে টানা তিন দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণে পার্বত্য রাঙামাটি দেখেছিল প্রকৃতির এক নির্মম তাণ্ডব। সেই প্রলয়ঙ্করী পাহাড় ধসে সেনাসদস্যসহ অন্তত ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। দীর্ঘ এক দশক পার হতে চললেও, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমেনি; বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাহাড়ের ঝুঁকি।
এক অভিশপ্ত জুন: ২০১৭-এর স্মৃতি
২০১৭ সালের সেই বিপর্যয়ে রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলা লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। নারী, শিশু ও পুরুষ—নির্বিশেষে অসহায় মানুষগুলোর জীবন কেড়ে নিয়েছিল ভূমিধস। উদ্ধার অভিযানে নেমে মানিকছড়িতে প্রাণ দিতে হয়েছিল দায়িত্বপালনরত সেনা সদস্যদেরও। সেই দুর্যোগ কেবল প্রাণই নেয়নি, ভেঙে দিয়েছিল পুরো জেলার যোগাযোগ ও অবকাঠামো ব্যবস্থা। রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও কাপ্তাইয়ের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরো অঞ্চলটি দীর্ঘ সময় বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলাটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৭ সালের সেই ঘটনা ছিল এই অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। এর পরবর্তী বছরগুলোতেও নানিয়ারচর ও কাপ্তাইসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ:
- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা: প্রায় ১০০টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে।
- শহরের চিত্র: শুধুমাত্র রাঙামাটি শহরেই প্রায় ৩০টি স্থান পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
- ঝুঁকিতে থাকা মানুষ: প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাহাড়ের পাদদেশ ছাড়া তাদের থাকার মতো নিরাপদ কোনো বিকল্প জায়গা নেই। অভাব-অনটনের সংসার সামলাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি জেনেও তারা পাহাড়ের ঢালে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতি বছর বর্ষা এলেই তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, কিন্তু স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’ রাঙামাটি শাখার নেতাদের মতে, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হলে প্রশাসন কিছু সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালায়, মাইকিং করে এবং প্রচারপত্র বিলি করে। কিন্তু মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব উদ্যোগের ইতি ঘটে।
তাদের অভিযোগ, পাহাড় ধস রোধে কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা কঠোর আইন প্রয়োগ না থাকায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে মাইকিং এবং সাইনবোর্ড স্থাপনের কাজ করা হয়েছে। বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে প্রশাসন স্বীকার করেছে যে, স্থায়ী পুনর্বাসন একটি সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। তবুও পাহাড় ধস নিরসন ও বাসিন্দাদের নিরাপদ আবাসনে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
৯ বছর আগের সেই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল প্রকৃতির রুদ্ররূপ। অথচ দীর্ঘ সময়েও পাহাড়ের পাদদেশে বসতি নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কেবল দুর্যোগকালীন জরুরি প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; পাহাড়ের ঢালে বসতি স্থাপন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে, অদূর ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
আরু/



