জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চ বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। প্রতিবছর এখানে জড়ো হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। তবে সময়ের সঙ্গে এই মঞ্চে শুধু কূটনৈতিক বক্তব্যই নয়, ঘটেছে নানা নাটকীয় ও বিতর্কিত ঘটনাও। কখনো ক্ষোভে টেবিলে আঘাত, কখনো দীর্ঘ ভাষণ, আবার কখনো প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি, বিশ্বনেতাদের এসব মুহূর্ত জাতিসংঘের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় ফিরে আসে।
নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘জুতো বিতর্ক’ – ১৯৬০
সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভকে ঘিরে জাতিসংঘের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৬০ সালে। ফিলিপাইনের প্রতিনিধি লরেঞ্জো সুমুলং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমালোচনা করলে ক্রুশ্চেভ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। জাতিসংঘের ঐতিহাসিক নথিতে বলা হয়েছে, তিনি নিজের ডেস্কে মুঠি দিয়ে আঘাত করার পর জুতো খুলে সেটি দিয়ে ডেস্কে আঘাত করেন।
তবে ‘জুতো দিয়ে টেবিল পেটানোর’ পুরো ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের নিজস্ব আর্কাইভও ঘটনাটিকে দীর্ঘদিনের একটি কিংবদন্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফিদেল কাস্ত্রোর দীর্ঘতম ভাষণ – ১৯৬০
একই বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ ভাষণ দেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই অধিবেশনে কাস্ত্রোর ভাষণ ছিল সাধারণ পরিষদের নথিভুক্ত দীর্ঘতম সময়ের ভাষণ।
দীর্ঘ এই বক্তব্যে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। ভাষণের ব্যাপ্তির কারণেই এটি জাতিসংঘের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
ইয়াসির আরাফাতের ‘জলপাই শাখা’ বার্তা – ১৯৭৪
১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) তৎকালীন নেতা ইয়াসির আরাফাত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। তার ভাষণের শেষ দিকে তিনি শান্তির প্রতীক জলপাই শাখা এবং ফিলিস্তিনি সংগ্রামের প্রতীকী উল্লেখ করেন।
আরাফাত বলেন, তিনি জলপাই শাখা ও একজন স্বাধীনতাসংগ্রামীর প্রতীক নিয়ে এসেছেন এবং জলপাই শাখাটি যেন তার হাত থেকে পড়ে না যায়। জাতিসংঘের সরকারি নথিতেও তার এই বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন।
হুগো চাভেজের ‘সালফারের গন্ধ’ – ২০০৬
২০০৬ সালে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ জাতিসংঘের মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন।
বুশের আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে চাভেজ বলেন, ‘শয়তান’ এখানে এসেছিল এবং তার উপস্থিতির ‘সালফারের গন্ধ’ এখনো রয়েছে। বক্তব্যের সময় তিনি বুশ যে পডিয়ামে দাঁড়িয়েছিলেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে এই মন্তব্য করেন।
চাভেজের এই বক্তব্য দ্রুত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে এবং জাতিসংঘের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক মুহূর্তে পরিণত হয়।
মুয়াম্মার গাদ্দাফির দীর্ঘ ভাষণ ও জাতিসংঘ সনদ নিয়ে নাটকীয়তা – ২০০৯
২০০৯ সালে লিবিয়ার তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। নির্ধারিত ১৫ মিনিটের সময়সীমা পেরিয়ে তার বক্তব্য চলে প্রায় ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট। জাতিসংঘের নিজস্ব রেকর্ডেও ভাষণের সময় ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাষণে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ও ভেটো ক্ষমতার তীব্র সমালোচনা করেন। একপর্যায়ে হাতে থাকা জাতিসংঘ সনদের কপি নিয়ে নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি করেন এবং সেটি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
জাতিসংঘের মঞ্চে এসব ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দেয়নি, বরং বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসেও তৈরি করেছে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত। কূটনৈতিক বক্তব্যের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বিশ্বনেতাদের এমন নাটকীয় আচরণ আজও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আসছে।
আরু|



