রাজনীতি করা সবার সাংবিধানিক অধিকার। যে কেউ যেকোনো দলের পক্ষ নিয়ে কাজ করতে পারে। কিন্তু গত ১৭ বছরে এই অধিকার অনেকের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কেন এমন হয়েছে তা আমরা সকলেই জানি। যারা আওয়ামী লীগের বাইরে থেকে নির্বাচন করেছে, তারা এই বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছে—এবিষয়ে আমি বহুবার লিখেছি, আবার লিখতে বসলাম।আজ লিখতে বসেছি পটিয়া বুথপুরা ইউনিয়নের সেই চেয়ারম্যান খায়েছের কথা, যিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব না পেয়ে, এবং নির্বাচন সংক্রান্ত একটি মামলা করার অপরাধে মিথ্যা হত্যার মামলায় গত দুই বছর ধরে কারাগারে আছেন। ক্ষমতাসীন শাসকের দালাল এবং কেডিএস খলিলের ভাগিনা আবুল কাসেম এই ষড়যন্ত্রের হোতা।খায়েছ একজন দুবাই প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং মনের গভীরে জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং বেগম খালেদা জিয়ার ও তারেক জিয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
দেশের এবং বিদেশের মাটিতে বিএনপির জন্য কাজ করেছেন তিনি, বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের পাশে থেকেছেন। ২০১৬ সালে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। তখনও বিএনপির নাম বলাটা অপরাধের সমান ছিল, কিন্তু খায়েছ ভয় পাননি। সেই নির্বাচনে খাইয়েছ জয়ী হলেও কাসেমের কালো টাকা এবং পটিয়ার এমপি শামসুল হক চৌধুরীর (বিচ্ছুর) অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে তিনি চেয়ারম্যান পদে আসতে পারেননি। এরপর ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন খায়েছ, কিন্তু আবারও এমপি বিচ্ছুর হস্তক্ষেপে কাসেমকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। খায়েছ এই অবৈধ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার রায় তার পক্ষে আসার সম্ভাবনা দেখে কাসেম ষড়যন্ত্র শুরু করেন। খাইয়েছের সমর্থকদের উপর নির্যাতন চালাতে থাকেন।
এক পর্যায়ে ২০ এপ্রিল ২০২২, ৯ই রমজানে,তারাবির নামাজের পর এলাকার প্রতিবাদী যুবক শরীফের উপর কাসেমের বাহিনী হামলা চালায়। শরীফ নিজেকে রক্ষার জন্য “শরীফ” একটি চা দোকান থেকে ছুরি নিয়ে হামলাকারীদের আক্রমণ করে, সেই ছুরির আঘাতে কাসেমের ছোট ভাই সোহেল মারা যায়। খায়েছ তখন চট্টগ্রাম শহরের সুগন্ধা এলাকায় তারাবির নামাজে ছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি করে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। মামলার রুজু হওয়ার আগেই খায়েছকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হয়। আমি প্রশাসনের সাথে কথা বলে খাইয়েছকে কিছুটা সময়ের জন্য রক্ষা করতে সক্ষম হই। তবে, পরে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় এবং গ্রেফতার করা হয়।
আমি প্রধানমন্ত্রী এবং আইজিপির কাছে আবেদন করেছিলাম নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য। পরে পিবিআই মামলাটি তদন্ত করে খাইয়েছসহ ৮ জনকে নির্দোষ হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু কাসেম সেই তদন্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করে সাজ সিট স্থগিত করিয়ে নেয়, ফলে খায়েছের হাইকোর্ট থেকে জামিনও বাতিল হয়।
খাইয়েছ গত দুই বছর ধরে কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কারাগারেও তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। তার বাবার মৃত্যু হলে খাইয়েছকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আজ এই স্বৈরাচারী আচরণের অবসান হতে পারে—এই বিশ্বাস নিয়ে খায়েছের পরিবার বিএনপির সিদ্ধান্ত এবং আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। আশা করছি, সুষ্ঠু বিচার পেয়ে খাইয়েছ মুক্তি পাবেন এবং এদেশের আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। এই বিষয়ে কিছু আলাপের প্রয়োজন রয়েছে- একটু আলাপ করি-রাজনৈতিক হয়রানি ও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজনের কথা বলতে হলে,তাহলে বলতে হয়
একজন নাগরিকের রাজনীতি করার অধিকার সাংবিধানিক ভাবে সুরক্ষিত। কিন্তু বাংলাদেশে আজ এই অধিকার শুধুমাত্র একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সংরক্ষিত হয়ে গেয়েছিল। যারা ভিন্নমত পোষণ করে, বিশেষ করে যারা বিএনপি জামায়াতের রাজনীতি করে, তাদেরকে নানা ধরনের হয়রানি এবং মিথ্যা মামলার মাধ্যমে নিপীড়ন করা হয়েছে। পটিয়ার খায়েছ এমনই একজন ভুক্তভোগী, যিনি শুধুমাত্র বিএনপি করার “অপরাধে” মিথ্যা মামলার ফাঁদে পড়ে কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার মতো আরও অনেকেই আছেন যারা মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের নির্যাতন এবং নিপীড়ন দিনের পর দিন বেড়েই চলেছিল।
খায়েছের এই দুর্ভোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের এপ্রিলে। এলাকায় কাসেম চেয়ারম্যানের বাহিনীর অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে খাইয়েছের সমর্থনে জনগণ তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু কাসেমের ষড়যন্ত্রের কারণে খায়েছকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা শুরু হয়। ঘটনার দিন যখন কাসেমের বাহিনী খায়েছকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করার জন্য তৎপর ছিল, তখন আমি সরাসরি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের অনুরোধ জানাই। আমি নিজেও সেই রাতে খায়েছকে চেরাগী পাহাড়স্থ আমার অফিস থেকে এনে আমার বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলাম।
পরিস্থিতি যখন আরও ঘোলাটে হতে থাকে এবং পুলিশ খায়েছকে গ্রেফতারের জন্য শহরে অভিযান শুরু করে, তখন আমি তাকে আমার বাসায় নিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প পথ ছিলোনা। পুলিশের উদ্দেশ্য ছিল তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো। কিন্তু আমি পুলিশকে আইন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিই যে, মামলার রুজু হওয়ার আগে তারা খাইয়েছকে গ্রেফতার করতে পারবে না। আমার আইনসম্মত বাধার মুখে পুলিশকে ফিরে যেতে বাধ্য হতে হয়। পরবর্তীতে যখন তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করার চেষ্টার পুনরাবৃত্তি করা হয়, আমি কোর্ট বিল্ডিংয়ে উপস্থিত থেকে খায়েছকে আইনজীবীর চেম্বার থেকে উদ্ধার করি।
এমনকি, আমি নিজেই আইজিপি, ডিআইজি, এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে খাইয়েছের মিথ্যা মামলার বিষয়টি উপস্থাপন করেছি এবং সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পিবিআই’র কাছে হস্তান্তরের আবেদন জানিয়েছি। পিবিআই পরবর্তীতে খাইয়েছসহ নির্দোষ ৮ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়, কিন্তু কাসেম হাইকোর্টের মাধ্যমে আবারও ষড়যন্ত্র করে এই সাজ সিট স্থগিত করিয়ে নেয়। এই অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এখন আমাদের দায়িত্ব।
আমরা যদি সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে এই ধরনের অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যারা ক্ষমতার জোরে নিরীহ মানুষের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে আনে, তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি যারা এই ধরনের অপরাধ করছে, তাদের সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অন্যায় আর কেউ করার সাহস না পায়।
এই লেখার মাধ্যমে আমি সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি, আমরা যেন এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। কোনো নিরপরাধ মানুষকে আর যেন মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো না হয়,খাইয়েছের মতো একজন উদীয়মান প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং বিএনপি পরিবারের ঘনিষ্ঠ কর্মী, বড় আত্মা ও বড় মনের মানুষকে রাজনৈতিক কারণে বারবার হয়রানি করা এবং জঘন্য হত্যার মামলায় আসামি করা—এর ফলে তার ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়েছে, একজন প্রতিবাদী ও সাহসী পুরুষকে দমিয়ে রাখা কতটুকু উচিত ছিল, তা আজ প্রশ্ন করছেন হাজারো খায়েছের বক্তারা।
খায়েছের অধীনে দেশ এবং দেশের বাইরে শত শত মানুষ কাজ করত; আজ সেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। নির্বাচনের মাঠে ও মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে খাইয়েছের অন্তত ১০ কোটি টাকা নগদে ক্ষতি হয়েছে, এবং তার শত কোটি টাকার ব্যবসাও আজ হাতছাড়া হয়ে গেছে। পরিবার-পরিজনদের জন্য যে সহায়তা করতেন, তাও আজ করতে পারছেন না। বিশেষ করে বিএনপির দুঃসময়ে শত শত কর্মীকে যে ধরনের সহযোগিতা করতেন, তা আজ আর করতে পারছেন না।
সবকিছু বিবেচনা করলে, একটি অমানবিক নির্যাতনের চিত্র আমাদের চোখের সামনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খাইয়েছের এই যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা কেবল একজন মানুষের দুর্ভোগ নয়; এটি একটি আদর্শের প্রতি সহিংস আঘাত। তবে আমি আশাবাদী যে খাইয়েছ আবারও ঘুরে দাঁড়াবেন, যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে তার দল বিএনপি। বিএনপির হাত ধরে তিনি আবারও মানুষের সেবায় এগিয়ে যাবেন। তার সোনালী সময় হয়তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে খায়েছ মানুষের জন্য কাজ চালিয়ে যাবেন।
খায়েছের মতো মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। এই অন্যায় ও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যাতে আর কোনো খাইয়েছের এমন মর্মান্তিক পরিণতি না হয় এটাই আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আইন এবং বিচার ব্যবস্থা যেন স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে, এটাই হোক আমাদের সবার প্রার্থনা।
লেখক:সাংবাদিক, গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।



