জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা এবার পড়তে পারে গণপরিবহনের ভাড়ায়। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ। প্রাথমিক প্রস্তাবে দূরপাল্লা ও নগর দুই ধরনের বাসেই কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন ভাড়া আপাতত অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকাই থাকতে পারে।
কী হারে বাড়তে পারে ভাড়া?
সোমবার বিআরটিএর বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে নতুন ভাড়া নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তঃজেলা বা দূরপাল্লার বাসের বর্তমান কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে হতে পারে ২ টাকা ৪৩ পয়সা।
অন্যদিকে নগর বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এএসএম আহমেদ খোকন জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে আরও বেশি ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মালিকেরা কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আলোচনার পর ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এর মূল কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।
গত রোববার রাতে সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। নতুন দরে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।
সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে নতুন দাম।
গণপরিবহনের বড় একটি অংশ ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানি খরচ সরাসরি বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে চালক-শ্রমিকের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশসহ বাস পরিচালনার অন্যান্য ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
যদি প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন হয়, তাহলে দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং নগর বাসেও একই হারে ভাড়া বাড়বে।
অর্থাৎ দূরত্ব যত বেশি, মোট ভাড়ার ওপর প্রভাবও তত বেশি হবে।
তবে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়া অপরিবর্তিত থাকলে প্রত্যেক যাত্রীর ভাড়া একই হারে বাড়বে না।
এবারের প্রস্তাবটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে একাধিকবার বাসভাড়া পরিবর্তন করা হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলেও ডিজেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা হয়। পরে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা করা হয়েছিল।
এরও আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে এক লাফে ১১৪ টাকা করা হলে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ৪০ পয়সা এবং মহানগরের বাসে ৩৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল।
পরে ডিজেলের দাম ৫ টাকা কমায় ওই বছরের ৩১ আগস্ট বাসভাড়াও কিছুটা কমানো হয়।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা কমার পরও ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় দূরপাল্লা ও মহানগরের ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩ পয়সা কমানোর সুপারিশ করেছিল বিআরটিএ।
বিআরটিএর ভাড়া সমন্বয় কমিটির সুপারিশ এখন সরকারের কাছে পাঠানো হবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে মঙ্গলবারের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
অর্থাৎ, প্রস্তাব অনুমোদিত হলে খুব শিগগিরই দেশের লাখ লাখ বাসযাত্রীকে নতুন ভাড়ায় যাতায়াত করতে হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ সামলাতে যে ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত কতটা বাড়তি চাপ তৈরি করবে সাধারণ যাত্রীর ওপর? আর সর্বনিম্ন ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা স্বস্তি দেবে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের তার উত্তর মিলবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর।
আরু|



