পটুয়াখালীর কুয়াকাটা-সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে জেলের জালে ধরা পড়েছে আকর্ষণীয় লালচে বর্ণের একটি সামুদ্রিক মাছ, যার নাম সোলজারফিশ (Soldierfish)। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Myripristis murdjan। রঙ, গঠন ও চোখের আকৃতির কারণে মাছটি স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে মাছটি আলীপুর মৎস্য বন্দরে আনার পর সেটি দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। পরে মাছটি বরফে সংরক্ষণ করা হয়।
জানা গেছে, ‘মায়ের দোয়া’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি ইদ্রিস কয়েক দিন আগে গভীর সমুদ্রে মাছটি জালে পান। অচেনা ও ব্যতিক্রমী দেখতে হওয়ায় সেটি ফেলে না দিয়ে তীরে নিয়ে আসেন। পরে মাছটি আলীপুর বন্দরের মেসার্স সিফাত ফিসে সংরক্ষণ করা হয়।
ট্রলারের মাঝি ইদ্রিস বলেন, জীবনে এই প্রথম এমন মাছ তার জালে ধরা পড়েছে। মাছটির রঙ ও গঠন এতটাই আলাদা যে সেটি সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
মেসার্স সিফাত ফিসের ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম শামিম জানান, আগে কখনো এমন মাছ দেখেননি। তাই আগ্রহের কারণে বরফে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
কী এই সোলজারফিশ?
ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডাব্লিউসিএস (WCS) ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান জানান, সোলজারফিশ Holocentridae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি সামুদ্রিক মাছ। এটি ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে বিস্তৃতভাবে পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছটি সাধারণত ৫ থেকে ২০০ মিটার গভীরতায় প্রবালপ্রাচীর, পাথুরে তলদেশ ও গুহাময় এলাকায় বসবাস করে। দিনের বেলায় আশ্রয়ে থাকলেও রাতে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। ছোট মাছ, চিংড়ি, জুপ্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী এ মাছের প্রধান খাদ্য।
এ মাছের বড় ও উজ্জ্বল চোখ কম আলোতেও সহজে দেখতে সাহায্য করে, যা গভীর সমুদ্রে টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন। লালচে রঙও গভীর পানিতে এক ধরনের ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করে।
গবেষকদের মতে, সোলজারফিশ সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ছোট প্রাণী খেয়ে যেমন খাদ্যচক্রের ভারসাম্য রক্ষা করে, তেমনি বড় শিকারি মাছেরও খাদ্য হিসেবে ভূমিকা রাখে। যদিও বৈশ্বিকভাবে এ মাছ বিরল নয়, বাংলাদেশের উপকূলে এটি খুব কম ধরা পড়ে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, সোলজারফিশ মূলত গভীর সমুদ্রের প্রবালপ্রাচীর ও পাথুরে পরিবেশে বসবাসকারী একটি প্রজাতি। স্থানীয় জেলেদের জালে খুব কম ধরা পড়ায় এটি সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। এ ধরনের মাছ ধরা পড়া বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তাই ভবিষ্যতে কোনো অচেনা বা বিরল প্রজাতির মাছ ধরা পড়লে তা দ্রুত মৎস্য বিভাগকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মাছের উপস্থিতি বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করে এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণে আরও তথ্য সংগ্রহে সহায়ক হতে পারে।
আরু/


