আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হলো। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। মোট ১৯০টি ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসের পক্ষে ভোট পড়েছে ৯১টি।
মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের বিধিমালার ৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ভোটগ্রহণের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন।
আঞ্চলিক আবর্তন নীতিমালা অনুযায়ী এবারের সভাপতি পদ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে জয়ী হন বাংলাদেশের প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ সর্বশেষ ১৯৮৬-৮৭ সালে এই মর্যাদাপূর্ণ পদটি লাভ করেছিল, যখন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। চার দশক পর বাংলাদেশ পদটি পুনরুদ্ধার করলো।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন ড. খলিলুর রহমান।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এই অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। ওই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
কে এই ড. খলিলুর রহমান?
ড. খলিলুর রহমান ১৯৫৪ সালের ১লা এপ্রিল ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কাইলাইল ইউনিয়নের পাড়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৭৭ সালের বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি এবং একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তিনি হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
ড. খলিলুর রহমান একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ, যিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি।
এই বিজয়কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সাফল্য হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার এটি স্পষ্ট প্রমাণ।
বিজয়ের পর ড. খলিলুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ শান্তি, সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির পক্ষে কাজ করে এসেছে। বিশ্ব আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপের মাধ্যমে আমরা একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে চাই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশ এখন আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে।
আজ শুধু জাতিসংঘে একজন বাংলাদেশি নির্বাচিত হননি — বিশ্ব নেতৃত্বের মঞ্চে আরও একধাপ এগিয়ে গেছে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ।



