
মো. কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বর আলীর বলী খেলা উপলক্ষে বিগত সময়ের মতো চট্টগ্রামের বলি খেলাও মেলার ইতিহাস ঐতিহ্য ভিত্তিক এ লেখাটি চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের প্রতিটি খেলা ও মেলা প্রেমীদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করলাম
লালদীঘির ময়দানে বলী খেলা দেখার জন্য আমরা দল বেঁধে বোয়ালখালী চরণদ্বীপ থেকে স্কুল ফাঁকি দিয়ে চলে আসতাম। বলী খেলার মূল আকর্ষণ মেলা। এই মেলাতে পাওয়া যাইনা এমন কিছু নেই তবে আমাদের প্রথম কাজ ছিলো সিনেমা প্যালেস অথবা খুরশিদ মহলে পুরাতন বাংলা সিনেমা দেখা। ১৯৬৯ সালের বিখ্যাত বাংলা সিনেমা রাজ্জাক কবরি অভিনয়ত কাজী জহির পরিচালিত “ময়না মতি” সিনেমা দেখেছিলাম, রাজ্জাক কবরির অসাধারণ অভিনয়ের কথা এখনো ভুলিনি, সিনেমা দেখে গিয়ে বাড়ীতে আমরা দলবদ্ধ হয়ে সিনেমার গল্প গুলো করতাম। গল্পে এমন ভাব নিতাম মনেহতো আমরাই নায়ক। কি মজার সোনালী সেই শৈশবের স্মৃতি রয়েছে আমাদের জীবনে। এখনতো সেই বাংলা সিনেমার সোনালী যুগ নেই। একবার সিনেমা দেখে গেলে তা কয়েক মাস বা বছর মনে থাকতো।
একবার বলী খেলা দেখে গিয়ে বাড়িতে আমি আমার ভাতিজা দুলালের সাথে ভরা পুকুর পাড়ে বালুর মধ্যে
বলী খেলতে গিয়ে আমার বাম হাত ভেঙে গিয়েছিলো। অনেক দিন কষ্ট পেয়েছি। বলী খেলা দেখা ও বলী খেলায় অংশ নেয়ার মজা ভিন্নতর। আজকাল মানুষ নিজ কর্মে ব্যস্ত এবং দারিদ্র্যতার দরুণ খেলা ও মেলাকে আনন্দ উৎসব মনে করে না।
বলী খেলার আদিবৃত্তান্ত টানতে গেলে দেখা যাবে আবহমান কাল থেকে মানুষ বলী খেলার আনন্দে মেতে থাকত। তবে অনেক স্থানে অনেক বলী খেলার আয়োজন এখন বিলুপ্তির পথে, চট্টগ্রাম শহরের বুকে আবদুল জব্বারের বলী খেলা ব্যতিত। তাই বলী খেলার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর তথ্য মতে দেখা যায়, বলী খেলার নামটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাম। এর আভিধানিক নাম হলো ‘মল্লযুদ্ধ’ বা কুস্তি প্রতিযোগিতা। মল্লযুদ্ধের ঐতিহ্য সুপ্রাচীনকালের। চট্টগ্রামের মল্ল নামে খ্যাত বহু প্রাচীন পরিবার দেখা যায়। চট্টগ্রামে বাইশটি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ। তারা সকলেই চট্টগ্রামের ১০টি গ্রামে বাস করতেন। যেমন আসিয়া গ্রামে আমান শাহ মল্ল, চাতরি গ্রামে চিকন মল্ল, কাথারিয়া গ্রামে চাঁন্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ইদু মল্ল ও নওয়াব মল্ল, হাইদগাঁওয়ের অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল , পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিল্লোল মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল , ঈশ্বরখাইনের গণি মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরালার চুয়ান মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, শোভনদন্ডির তোরপাচ মল্ল, পোপাদিয়ার জুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহতার ইয়াছিন মল্ল প্রভৃতি। তখন থেকে চট্টগ্রামে মল্লরা বলী আর বলী খেলা নামে খ্যাত। উত্তর চট্টগ্রামের মুসলিম মল্ল পরিবারের নাম জানা না গেলেও বহু খ্যাতনামা বলী বা কুস্তিগিরের নাম জানা যায়। সুপ্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি প্রতিযোগিতা বহুলভাবে প্রচলিত ছিল। তবে তা ছিল সীমাবদ্ধভাবে প্রচলিত। চট্টগ্রামের মত সারা দেশে প্রতিটি গ্রামে চৈত্র-বৈশাখ এই দু’মাসব্যাপী বাঙালির উৎসব আকারে বলী খেলা প্রায় জেলায় প্রচলিত ছিল বলে প্রতীয়মান। তখন কিন্তু জেলার বিভিন্ন গ্রামের এক প্রান্তের বলীরা (মল্ল) অপর প্রান্তে অনুষ্ঠিত বলী খেলায় গাঁটের পয়সা খরচ করে যোগদান করত। অনেকে মনে করেন যে, চট্টগ্রামের প্রচলিত বলী খেলার জনপ্রিয়তা সম্ভবত প্রাচীন আরব প্রভাবের ফলশ্রæতি। এই প্রসঙ্গে কবি আলাদিন আলী নূর বর্ণিত বলী খেলার উদ্ভবের ইতিকাথার বিবরণটি উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর চৈত্র মাসের শেষার্ধে আর বৈশাখের প্রথম দিকে বসে বলী খেলার আসর। সঙ্গে সঙ্গে বসে আনন্দমেলা, নয়া নয়া পণ্যের হয় আমদানি, চলে হরদম বেচাকেনা। চারদিকে শুনি বাদ্যধ্বনি আর সাঁনাইয়ের আওয়াজ। যখন শোনা যায় যে, দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে- অর্থাৎ ১৩৪৫-৪৬ সালে পরিব্রাজক ইবনে বতুতা পরিদর্শন ধন্য বরহনক থেকে আনক্যা বলীরা খেলায় যোগ দিতে আসতো।, তখন দর্শকদের আগ্রহ ও উত্তেজনা বেড়ে যায়। কবি কালিদাসের জন্মভূমি পশ্চিম মানব অর্থাৎ পটিয়ার মালিয়ারা থেকে এবং কবি আফজাল আলীর জন্মভূমি পূর্ব মানব থেকে অর্থাৎ সাতকানিয়ার মনদেশ থেকে মিলুয়া থেকে সর্বপ্রথম মল্ল ক্রীড়ার অনুসঙ্গী হিসেবে বলী খেলার উদ্ভব এবং পরে সমগ্র চট্টগ্রামে ব্যপ্ত হয়। কবি আলাদিন আলী নূরের পটিয়ার মালিয়ারা ও সাতকানিয়ার মিলুয়াকে মহাকবি কালিদাসের জন্মভূমি মানব কল্পনা, আনীক এবং সেখানে বলী খেলার উদ্ভব কল্পনাতেই সম্ভব। তার এই মতের সঙ্গে কেউ একমত হবেন না। কারণ চট্টগ্রামের অন্য কোন এলাকায় প্রাচীনকালের যে মল্লবীর ও মল্লক্রীড়া প্রচলিত ছিল না তিনি বলতে পারলেন কি করে? মালিয়ারা মিনয়ারাপ নামের গ্রামেই যদি মল্লবীর ও মল্লক্রীড়া জন্মস্থান হয় তবে রাউজান থানার মিলুয়া গ্রামের অধিবাসীরাও দাবি করতে পারে যে, সেখানে মল্লক্রীড়া বা বলীখেলার উদ্ভব হয়েছে। তখন তিনি তাদের দাবি নাকচ করবেন কি করে? মল্লক্রীড়া বা বলীখেলার জন্মস্থান এতসব উদ্ভব কল্পনা করে বলা যায় যে, পুরো বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশেই মল্লক্রীড়া বা বলী খেলা প্রচলিত ছিল অতি সুপ্রাচীনকাল থেকে। তবে স্থানভেদে এর নাম রুপ ভিন্ন ভিন্ন ছিল। এক সময় সিলেট জেলায়ও বলী খেলার প্রচলন ছিল। তবে সেখানে এর নাম ও অনুষ্ঠান সময় ছিল ভিন্ন। সিলেটে বলী খেলা ‘মালখেলা’ নামে খ্যাত। এই নামটি মল্লক্রীড়া-মল্লখেলা-মালখেলা রুপে বিবর্তিত হয়েছে। মল্ল থেকে হয়েছে মালা। সিলেটে মাল খেলা অনুষ্ঠিত হয় শরৎ ও হেমন্তকালে। এই সময় সিলেটের গ্রাম হাটবাজারে ঢোল সহরতযোগে মালখেলা অনুষ্ঠানের তারিখ প্রচারের প্রচলন ছিল। তবে মালখেলা জাঁকজমকের সাথে অনুষ্ঠিত হতো। খেলার সময় দুই মাসের মধ্যে যারা কুস্তি জোড়া মিলিয়ে দেয় তারা ‘ছড়াবদ্দার’ নামে খ্যাত হয়। ছড়াবদ্দার শব্দের শুদ্ধরুপ মোটাবদার। অর্থ লাঠিধারী বা বাহক হলেও সিলেটে ছড়াবদ্দার শব্দটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। ছড়াবদ্দার মূল অর্থ মালখেলার পরিচালক। এককালে চট্টগ্রাম জেলার প্রায় গ্রামে ছোটবড় বলী খেলা অনুষ্ঠিত হতো। যথাক্রমে পটিয়ার বলী খেলা, কৃঞ্চনাজির বলী খেলা, পরন বলী খেলা, ঠেগেরপুনি বলী খেলা, সিকদারের বলী খেলা, তুফান আলী মুন্সীর বলী খেলা, ইলিশ্যার বক্স হাকিমের বলী খেলা, সাতকানিয়ার মক্কার বলী খেলা, লোহাগাড়ার ছিদ্দিক মিয়ার বলী খেলা ইত্যাদি। উত্তর চট্টগ্রামের ফতেপুরের বলী খেলা, মাদ্রাসার বলী খেলা, হাটহাজারীর বলী খেলা, নদীমপুরের বলী খেলা, কধুরখলি কুয়ারবিলের বলী খেলা প্রভৃতি। এ জেলার প্রতিনিধিস্থানীয় বলী খেলা ছিল গইন্যা বলী, মিরাবলী, আছদ আলী বলী, আহমদ ছফা বলী, ওয়ালী বলী, এয়াকুব আলী বলী, সুলতান বলী, টুইক্যা বলীসহ ঐসব বলীরা দেশ বরেণ্য বলী ছিলেন। চট্টগ্রামে এখনো বহু বাড়ির পরিচিতিতে বলীর নাম যুক্ত আছে। যেমন ওয়ালী বলীর বাকলিয়ার বলির হাট ও বলীর বাড়ি ইত্যাদি। সেকালে চট্টগ্রাম জেলার দুর্বললোক জীবিকা উপলক্ষে
ব্রহ্মদেশে প্রবাস জীবন যাপন করতো। কিন্তু বলী খেলার মৌসুমে চৈত্র-বৈশাখ মাসে তাদের একটি অংশ এদেশে চলে আসতো বলী খেলা খেলতে ও দেখতে। বলী খেলার প্রতি প্রচন্ড নেশা ছিল চট্টগ্রামবাসীর।কোন গ্রামে
বলী খেলা অনুষ্ঠানের আগে দিন তারিখ ধার্য করে পার্শ্ববর্তী একাধিক থানার হাটবাজারে ঢোলবাদ্য সহকারে প্রচার অভিযান চালানো হতো এবং সে সঙ্গে দু’বলীর কুস্তিরত ছবিযুক্ত বিজ্ঞপ্তি বিলি করা হতো। খেলার দিন খেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে সকাল থেকে ঢোল বাদ্য বাজনা হতো। দুপুর নাগাদ দর্শক ও বলীর দল ঢোলবাদ্যসহ খেলার স্থানে হাজির হতো। খেলার আয়োজকরা আয়োজন অনুসারে ৫ থেকে ১২টি দল অথবা ততোধিক বলীর দল খেলায় অংশগ্রহণ করত। তাদের ঢোলবাদ্যের খরচ খেলার আয়োজকরাই বহন করতো। খেলার প্রারম্ভে একজন বিশেষ ব্যক্তিকে সভাপতি করা হয়। সভাপতির কাজ হলো বিজয়ী বলীদের গলায় মেডেল পরিয়ে দেয়া। খেলার প্রথম জুনিয়র বলীদের খেলা হতো। তাদেরকে বলা হতো ‘খিরা বলী’ বা জুনিয়ার বলী। অবসর গ্রহণকারী বলীগণ কুস্তির জোড়া মিলিয়ে দিতো। প্রতিদ্বন্ধি বলীদের যে প্রথম পিঠ মাটিতে লাগিয়ে দিতে পারবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সাধারণত বিকালের দিকে বলী খেলা আরম্ভ হয়। বিজয়ী বলীদের মেডেল পরিয়ে দেয়ার পর দীর্ঘকক্ষণ
নাচ চলতো বিজয়ী বলীদেরকে নিয়ে। ইতিহাসবিদদের ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম হলো বলীর নাচ। সেখানে বলী খেলা যুব স¤প্রদায়ের কাছে অনেকটা সংক্রমক ব্যাধির মতো ছিলো। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে চট্টগ্রামের বলী খেলার আমেজ কমতে থাকে। বর্তমানে একেবারে বিলুপ্তির পথে। কেবল চট্টগ্রাম শহরের আবদুল জব্বারের বলী খেলা প্রতি বছর বৈশাখের ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। কুস্তি হয় একদিন কিন্তু মেলা অবস্থান করে একাধিক দিন। ১৯১০ সালে বন্দর শহর চট্টগ্রামের বদরপাতি নিবাসী পরলোকগত আবদুল জব্বার সওদাগর ১২ বৈশাখ তারিখে লালদীঘির ময়দানে সর্বপ্রথম বলী খেলার আয়োজন করেছিলেন। তখন থেকে অদ্যাবধি প্রতিবছর বৈশাখের ১২ তারিখে আবদুল জব্বারের বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তখন চট্টগ্রামে বলী খেলার স্বর্ণযুগ। তৎকালে ব্রহ্মদেশের আরাকান থেকে রোহিঙ্গা বলীরা ও বঙ্গদেশের বিভিন্ন জেলার খ্যাতনামা মল্লবীরা আবদুল জব্বারের বলী খেলায় অংশগ্রহণ করতে আসতেন। দেশ বিভাগের পূর্বে একবার এক ইংরেজ গভর্নর সস্ত্রীক আবদুল জব্বারের বলী খেলা দেখতে এসেছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৬২ সালে দু’জন ফরাসী মল্লবীর আবদুল জব্বারের বলীখেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশ ফিল্ম বিভাগ একবার ডকুমেন্টারি ফিল্ম হিসেবে জব্বারের বলী খেলার ছবি ধারণ করেছিলেন, যা লন্ডনের ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত বলে কথিত আছে।
আবদুল জব্বারের বলী খেলা অনুষ্ঠানের সপ্তাহ খানেক আগে থেকে আন্দরকিল্লা জুড়ে বসে গৃহস্থালী পণ্যসামগ্রীর প্রদর্শনী । তখন সেখানে হাড়ি পাতিল, খন্তা কুড়াল, মাথার জোংড়া পিড়ি, মোড়া, মাছ ধরার চাই ইত্যাদি যাবতীয় সামগ্রীর সমারোহ ঘটে। তখন আন্দরকিল্লার মোড়সহ শহরের বৃহত্তর এলাকা রাস্তাঘাট একেবারে বন্ধ থাকে। খেলার পরও বেচাকেনা চলে পণ্যসামগ্রীর। চট্টগ্রামের আবদুল জব্বারের ঐতিহ্যবাহী বলী খেলাই চট্টগ্রামের মানুষের একমাত্র আনন্দের উৎসব। প্রতিবছর বৈশাখের ১২ তারিখ আসলে প্রাচীন বলী খেলার দৃশ্য অবলোকন করার জন্য শহরবাসী ও গ্রাম গ্রামান্তর হতে এসে সমবেত হয়। জব্বরের বলী খেলায় আমাদেরকে হাজার বছরের বাঙালির লোকসংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। যোগাযোগ ধরে রাখে। মানুষের মিলন মেলা হোক এই বলী খেলা।এখন সি আরববি শিরীষ তলায় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় সাহাব উদ্দিন এর বলি খেলা।
আব্দুল জব্বার সওদাগরের ইতি কথা—
লালদীঘির বলী খেলা
বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ কেন্দ্রে লালদীঘির ময়দানে আবদুল জব্বরের বলী খেলা নামে প্রতিবছর ১২ই বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল জববারের মূল বাড়ী হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে। সম্ভবতঃ ১৮৯৩ খৃঃ তিনি চট্টগ্রাম শহরে এসে বসবাস শুরু করেন। চট্টগ্রামে একটি প্রবাদ আছে।
যদি ও পড়ে কহর; না ছাড়ি ও শহর। চট্টগ্রাম শহরে এসে তিনি ব্যবসার দিকে মনোযোগ দেন। ব্যবসায় তিনি বেশ উন্নতি লাভ করেন। অনেকের ধারণ আবদুল জব্বার কবি আলাউলের অধস্থন ৬ষ্ঠ পুরুষ কাল খোন্দাকারের বংশধর। হাটহাজারী ফতেপুরের ঐতিহ্যবাহী কুস্তিখেলা ও বলী খেলায় তার নেশা ও ঝোঁক ছিল বিধায় চট্টগ্রামে শহরেই তিনি ১৯০৯ খৃষ্টাব্দ হতে বলীখেলা দেয়া শুরু করেন। পরবর্তী এই বলীখেলা সমগ্র চট্টগ্রাম, আকিয়াব, ফেনীও কুমিল্লার অধিবাসীদের নিকট এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বলী খেলা ও মেলা পরিচালনার জন্য সরকারী ভাবে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মহোদয় উর্ধতন পুলীশ কর্মকতার সার্বিক সহযোগিতায় থাকেন। এই বলী খেলা শুরুর পর হতে ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত কোন বছর বাদ যায়নি। প্রতিবছর এই খেলা অনুষ্ঠিত হত। এমনকি ১ম বিশ্বযুদ্ধ, হয় বিশ্বযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই বলী খেলার তারিখ পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ১৯৯০ খৃষ্টাব্দে বৈশাখমাসের ১২ তারিখের পরিবর্তে তারিখে বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এর জন্য চারিদিকে প্রতিবাদ ও পত্রিকায় নানা ধরনের প্রতিবাদ পত্র ছাপাতে থাকে। মরহুম আবদুল জববার নামকরা বলী না হলেও খেলাধুলাকে কিন্তু প্রছন্দ করতেন। ১৯০৯ খৃষ্টাব্দে যখন প্রথম বলী খেলা শুরু হয় তখন বলী ছিল। বলীদের শরীরে বলছিল। তখনকার বলীরা ছিল শক্তিধর ও লড়তে পারতেন অনেকক্ষণ ধরে। লালদীঘির বলী খেলায় টেকনাফ্ সহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অনেক বলী আসেন। চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য জেলার বলীদের মধ্যে শ্রেষ্ট বলীদের খেলা হত লালদীঘির খেলায়। আর্ন্তজাতিক খেলাধূলায় যেমন বাছাই পর্ব খেলা হয় তেমনি গ্রামের অন্যান্য জেলার বলীখেলায় যে সব বলী কুস্তিতে জয়ী হতো তারাই লালদীঘির খেরায় কুস্তি ধরতে সাহস করতো। সোজা কথায় লালদীঘির আবদুল জব্বারের বলী খেলায় চট্টগ্রাম বলীদের চূড়ান্ত বা ফাইন্যাল খেলা। সাধারণত লালদীঘির বলী খেলার পর তেমন কোন বড় ধরণের বলী খেলা অনুষ্টিত হত না। এই ফাইন্যাল খেলায় দর্শকদের জন্য তৈরী হয় সারি-সারি মাছান। মাছানের ভাড়া দিলেই দর্শকদের উঠার সুযোগ দেয়া হয়। দর্শকদের ঠ্যালা আর মেলার পন্য পশারিদের জন্য তিল-ধরনে ঠাই থাকে না। শিশু
চট্টগ্রামের বলী খেলা
কিশোরদের জনা এক আমোদঘন পরিবেশ। লোকের কলকনালী, বাশির ব্যা বো নাগর দোলার কো-কো সারা লালদীঘি পাড় থাকে মুখরিত। প্রাচীন গ্রীসের জিউস দেবীর উপাসনা মেলাকে ও হার মানায়। এ’ যেন এক রম্য নগরী। অনেেেকর ধারণা লালদীঘির বলী খেলার মেলা দেশের সর্ববৃহৎ বড় বৈশাখী মেলা,। ১২ই বৈশাখ তারিখের ৩দিন আগে থেকেই শুরু হয় মেলার আয়োজন। দক্ষিণে কোতোয়ালীর মোড় পশ্চিমে সিনেমা প্যালেসের ইসলামাবাদ মার্কেট, উত্তরে আন্দর কিল্লার নজির আহমদ চৌধুরী রোর্ডের মাথা। পূর্বে লালদীঘির পূর্ব পাড় হয়ে শাহ আমানত শাহের দরগায়ে গেইট পর্যন্ত আর বক্সীর হাটের চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ১২ বর্গমাইল জুড়ে দেশীয় পণ্যের সমাবেশ ঘটে। এখানে পতেঙ্গার তরমুজ, কালী পুরের
লিচু। হাটহাজারীর মুড়ি, খৈ মেখলের বাঁশও বেতের সামগ্রী সাতকানিয়ার জাল, সিলেটের শীতল পাটি কুমিল্লার খদ্দরের কাপড়, পুলবোদা, পার্বত্য চট্টগ্রামের মেয়েদের তৈরী পোশাক। কুমারদের হাড়ি পাতিল বরুনা, কলসী টুল, টেবিল, বোড সহ এমন পণ্য নেই যাহা লালদীঘির মেলায় উঠেনা। এ মেলায় হয় সকল জিনিসের পণ্যের বেচা কেনার ঠেলা। শিশু- কিশোরদের জন্য এ’ মেলা যেন বাৎসরিক আনন্দ ও হাসির খুশীর দিন। চট্টগ্রাম ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেণী, নোয়াখালী, সন্ধীপ, কুমিল্লা, সিলেট থেকে আসে ব্যবসায়ীগণ। সঙ্গে আনে নানা জাতীয় পণ্য। ভাল ভাল তৈরী পণ্য রেখে দেয়া হয় লালদীঘির মেলায় জন্য। এই মেলার দর্শকদের চোখ যেমন রঙিন হয়ে যায়। যতই দেখে ততই কেনে। দাদার সাথে নাতীর হয় প্রতিযোগিতা। ১২ই বৈশাখের পরে আর তিনদিন চলে এই খেলার মেলা। বলীখেলার সময় দিন দুপুরে মেয়েরা এই মেলায় যায় না। রাত্রে দশটার পর শুর হয় গিন্নিদের আনাগোনা। হয়তো দিনের স্বামীর কেনা বা দেনের কেনা-সাংসারিক জিনিস পছন্দ হয়নি। তাই অনেক গিন্নী যেমন, নুর বেগম, শামমুর পাখীর মা, টুনীর মা, বাতাসীর মা, এনীর মা, সদ্ধীবের মা, সুমইন্যার মা।।
লেখক:সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক,গবেষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
email Kamaluddin 2247@gamal.com









